চেকের অমর্যাদার ধারণা|Concept of Dishonour of Cheque

চেকের অমর্যাদা কাকে বলে|What is Dishonour of Cheque?


ব্যাংক আমানতকৃত অর্থের জন্য আমানতকারীর নিকট দায়বদ্ধ। ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ চাওয়ামাত্র ফেরত দিতে বাধ্য। আমানতকারী চেকের মাধ্যমে তার আমানতকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করে। ব্যাংক কোনো কারণে চেকের অর্থ পরিশোধ না করলে তাকে চেকের অমর্যাদা বলা হয়। যে চেকের অর্থ ব্যাংক পরিশোধ করে না সে চেককে প্রত্যাখ্যাত চেক বলে। আদেষ্টার স্বাক্ষর না থাকলে, চেকে কোনো পরিবর্তন অনুমোদিত না থাকলে অথবা অপর্যাপ্ত অর্থ প্রভৃতি কারণে চেক প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

J. C. Woelfel- এর মতে,
চেকের অমর্যাদা বলতে আদিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহকের চেকের অর্থ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানানোকে বোঝায়। 

পরিশেষে বলা যায়, কোনো যৌক্তিক বা আইনগত কারণে ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ না করলে তাকে চেকের অমর্যাদা বলে।
চেকের অমর্যাদার ধারণা

চেকের অমর্যাদার কারণ|Reasons behind Dishonour of a Cheque


হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন অনুযায়ী ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে।

চেকের অমর্যাদা কি?

আমানতকারী কর্তৃক কোনো চেক ব্যাংকে উপস্থাপিত হওয়ার পর ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে চেকের অমর্যাদা বলে।

বিভিন্ন ন্যায়সংগত কারণে ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। নিম্নে চেকের অমর্যাদার কারণগুলো বর্ণনা করা হলো:

১. আদেষ্টার নিষেধ (Drawer's crentermand order): আদেষ্টা কোনো কারণে চেকের অর্থ পরিশোধে নিষেধ করলে, ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করে না। আদেষ্টার লিখিত ও স্বাক্ষরিত নিষেধাজ্ঞা পেলে ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ করবে না। কোনো কারণে আদেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত নিষেধাজ্ঞা দিতে না পারলে, পত্র বা টেলিফোনের মাধ্যমে ব্যাংককে তা জানাতে পারে। অবশ্য পরবর্তীতে তাকে অবশ্যই লিখিত নিষেধপত্র দিতে হবে। আদেষ্টার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক যদি চেকের অর্থ পরিশোধ করে তবে তার জন্য ব্যাংক দায়বন্ধ থাকবে।তবে আদেষ্টা ভিন্ন অন্য কোনো পক্ষের আদেষ্টার নির্দেশনায় ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধে বিরত থাকবে না।  

২. মৃত্যু (Death of drawer): চেক ইস্যুর পর আদেষ্টার মৃত্যু হলে এবং এই মৃত্যুর বিষয়ে অবহিত থাকলে ব্যাকে চেকের অর্থ পরিশোধ করবে না। এ কারণে যদি কোনো ক্ষতি হয় তার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দায়বন্ধ করা যায় না।

৩. আদেষ্টার মস্তিষ্ক বিকৃতি (Insanity of customer): আদেষ্টার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটলে এবং এ বিষয়ে উপযুক্ত প্রমাণ (ডাক্তারি সনদ, পাগলাগারদের সনদ) থাকলে ব্যাংক আদেষ্টার চেকের অর্থ পরিশোধ করে না। তবে চেক ইস্যুর সময় আদেষ্টা স্বাভাবিক থাকলে এবং পরবর্তীকালে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটলে ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ করতেও পারে। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংককে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

৪. আদেষ্টার দেউলিয়াত্ব (Insolvency of drawer): আদেষ্টা আদালত কর্তৃক অসচ্ছল বা দেউলিয়া ঘোষিত হলে ব্যাংক উক্ত আদেষ্টার চেকের অর্থ পরিশোধ করতে পারে না।

৫. গারনিশি আদেশ (Garnishe order): আদালত আমানতকারীর সম্পূর্ণ আমানতের ওপর গারনিশি আদেশ দিলে ব্যাংক উ আমানতকারীর চেকের অর্থ পরিশোধ করে না। তবে আমানতকৃত অর্থের অংশবিশেষের ওপর গারনিশি আদেশ দিলে অবশিষ্ট অংশের অর্থ দ্বারা পর্যাপ্ত হলে চেকের অর্থ পরিশোধ করতে পারে।

৬. স্বত্বর্পণ (Assignment): আদেষ্টা স্বত্বার্পণের মাধ্যমে তার ব্যাংক হিসাবে জমাকৃত অর্থ কাউকে প্রদান করলে, উক্ত অর্থের ওপর আদেষ্টার আর কোনো অধিকার থাকে না। এরূপ অবস্থায় ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ করবে না।

৭. ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট (Trust account): ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের তত্ত্বাবধায়ক (Trustee) যদি নিজ স্বার্থে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে চেক ইস্যু করে এবং এ বিষয়ে সন্দেহ করার যুক্তিসংগত কারণ ব্যাংক খুঁজে পায়, তবে ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করে না।

৮. অপর্যাপ্ত তহবিল (Insufficient fund): আমানতকারীর ব্যাংক হিসাবে চেকের অর্থ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করে না।

৯. পূর্ববর্তী তারিখের চেক (Post dated cheque): চেকে উল্লিখিত তারিখের পূর্বে ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করবে না।

১০. চেকের উপস্থাপন (Presentation of cheque): প্রাপক চেক যথাযথভাবে উপস্থাপন না করলে, ব্যাংক চেকের অর্থ পরিশোধ করে না। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকের অফিস চলাকালীন সময়ে (৯ টা থেকে ৫ টা) চেক উপস্থাপন না করলে ব্যাকে উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করে না।

১১. বাসি চেক (Stale cheque): চেকে উল্লিখিত তারিখের ছয় মাস পরে ঐ চেককে বাসি চেক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের চেকের অর্থ পরিশোধ করা হয় না।

১২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিবর্তন (Material alteration): চেকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- টাকার অঙ্ক, তারিখ প্রভৃতির পরিবর্তন এবং আদেশ চেককে বাহক চেকে রূপান্তর প্রভৃতি বিষয় শুধুমাত্র আদেষ্টা করতে পারে। কাজেই এসকল বিষয় পরিবর্তন করা হলে, পরিবর্তন হলে অবশ্যই আদেষ্টার স্বাক্ষর থাকতে হবে। অন্যথায় চেকের অর্থ ব্যাংক পরিশোধ করবে না। নিম্নোক্ত পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে আইনে বিবেচনা করা হয় এবং সেক্ষেত্রে চেকের অর্থ পরিশোধ করা যায়।

i. খোলা বা সাধারণ অনুমোদনকে পূর্ণ অনুমোদনে রূপান্তর।
ii. খোলা চেককে দাগকাটা চেকে রূপান্তর।
iii. সাধারণ দাগকাটা চেককে বিশেষ দাগকাটা চেকে রূপান্তর এবং
iv. বাহক চেককে হুকুম চেকে রূপান্তর।

১৩. আদেষ্টার স্বাক্ষর (Drawer signature): চেকে অবশ্যই আদেষ্টার স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং নমুনা স্বাক্ষরের সাথে তার মিল থাকতে হবে। অন্যথায় চেকের অর্থ পরিশোধ করা যায় না।

১৪. টাকার পরিমাণে গরমিল (Difference in amount): চেকে কথায় ও অঙ্কে টাকার পরিমাণে গরমিল থাকলে, ব্যাংক উক্ত চেকের অর্থ পরিশোধ করতে পারে না।

১৫. অনুমোদন (Endorsement): চেক অনুমোদিত হলে, অনুমোদন অবশ্যই যথাযথ হতে হবে। অন্যথায় চেকের অর্থ পরিশোধ করা হয় না।

১৬. অন্য শাখায় উপস্থাপন (Presentation in another branch): যে শাখায় আদেষ্টার হিসাব, সে শাখা ভিন্ন অন্য শাখায় উপস্থাপন করলে চেকের অর্থ পরিশোধ করা হয় না।

১৭. অন্যান্য (Other reasons): নিম্নোক্ত কারণেও চেকের অমর্যাদা করা হতে পারে:
i. চেকে হিসাব নম্বর না থাকলে।
ii. হুকুম চেকে প্রাপকের নাম না থাকলে।
iii. শর্তযুক্ত অনুমোদিত চেকের শর্ত পালন করা না হলে।
iv. দাগকাটা চেক ব্যাংকের মাধ্যমে উপস্থাপন না করলে এবং
v. হারানো চেকের বিষয়ে ব্যাংকের নিকট নোটিশ থাকলে। 

পরিশেষে বলা যায়, উপরিউক্ত এক বা একাধিক কারণে ব্যাংক চেক অমর্যাদা করতে পারে। এছাড়াও ব্যাংক যদি অন্য কোনো হতে না পারে সেক্ষেত্রেও চেকের অর্থ প্রদানে বিরত থাকতে পারে।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url